১৯৯৩ সালে হামবুর্গে পরিবারের সাথে ক্রিস্টমাস কাটিয়ে লন্ডনে ফিরে এলাম এবং আবার পাকিস্তান ভ্রমনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। আমি ও আমার বোন প্রথমে লাহোর যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম, যেখানে প্রথমে আমরা ইমরানের সাথে দেখা করবো এবং এর পর সিন্ধ এলাকা ভ্রমণ করবো।
ইমরান লাহোরে ওর বাবার বাসায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি ইমরানের লন্ডনের বাসায় ঢুকে দেখলাম, বাসাটা পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে আছে। আমি হিটিং এর সুইচ অন করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু দেখলাম সুইচ কাজ করছে না। পরে গ্যাসের লাইটের দিকে এগিয়ে গেলাম। যেই গ্যাসে আগুন জ্বাললাম, সঙ্গে সঙ্গে আগুনের বিশাল শিখা আমাকে দূরে নিক্ষেপ করলো। আমি আতঙ্কে লাফ দিয়ে উঠলাম এবং দেখলাম এক সেকেন্ডের মধ্যে ফায়ারপ্লেসের পাশে রাখা টাইগার ঘাসের স্তূপে আগুন লেগে গেল।
কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম, যে কাপড় দিয়ে সিলিং ঢাকা ছিল, সেখানেও আগুন ধরে গেছে। আমি দৌড়ে রান্নাঘরে গেলাম এক বালতি পানি এনে আগুন নেভানোর জন্য। কিন্তু এর মধ্যে সারা ঘর আগুনের শিখায় ভরে গেছে। সৌভাগ্যক্রমে আমার মাথা একটু হলেও কাজ করছিল। আমি দরজা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এলাম এবং কাঁপা কাঁপা হাতে ৯৯৯ নম্বরে ডায়াল করলাম। সেদিন ছিল ছুটির দিন এবং ফায়ার সার্ভিস আসতে অনেক বেশি সময় নিল। তার উপর, তারা ঠিকানা ভুল শুনেছিল, ফলে আমাকে বেশ কয়েকবার ফোন করতে হলো। অবশেষে রাস্তার শেষ মাথা পর্যন্ত দৌড়ে গিয়ে আমি তাদের পেলাম। তারা এসেই এক নিমিষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে এল। ফিরে যাওয়ার পথে ওরা আমার ঘাড় চাপড়ে অভয় দেয়ার চেষ্টা করলো এবং এভাবেই দুঃস্বপ্নটি শেষ হলো।
আগুন যা অবশিষ্ট রাখলো, তা হলো একটি কালো হয়ে যাওয়া ঘর, ভয়ানক পোড়া গন্ধ আর রুমের ভেতরের সব এলোমেলো জিনিস। এর মধ্যে ছিল পোড়া কাপড়, নষ্ট হয়ে যাওয়া সিডি ও কিছু কাগজ। একটা বই শুধু নষ্ট হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিল, সেটি হলো পবিত্র কুরআন।
আমি মরিয়া হয়ে চারদিক হেঁটে বেরিয়ে দেখলাম, তেমন ভয়ংকর কিছু ঘটেনি, আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত হয়ে পড়লাম। সম্বিত ফিরে পেতে আমার বেশ খানিকটা সময় লাগলো এবং অনুধাবন করলাম, যা ঘটেছে তা দ্রুত ইমরানকে খুলে বলা উচিৎ। এটি ছিল ইমরানের এপার্টমেন্ট, আর ইমরান ওর এপার্টমেন্টকে খুব পছন্দ করতো। ইমরান যখন লন্ডনে থাকতো, তখন এটিই ছিল ওর ব্যক্তিগত স্বর্গ। আর লন্ডনে ইমরানের এই এ্যাপার্টমেন্ট ছাড়া আর কিছু ছিল না। এছাড়া যা কিছু ছিল, সবই তার হাসপাতাল প্রকল্পের জন্য দান করে দিয়েছিল।
আমি এক বন্ধুর কাছে গেলাম, এবং ফোনে যখন লাহোরে থাকা ইমরানকে পেলাম, ভাবলাম, ইমরান হয়তো সব শুনে খুব রাগ করবে। কিন্তু সে শুধু একটি কথাই বললো, ‘আলহামদুল্লিহ। আমার গোনাহগুলো মাফ হয়ে গেছে। তুমি দ্রুত পাকিস্তান চলে এসো, তোমাকে খুব মিস করছি।’
ইমরান আমাকে কোনো দোষ দিল না, কোনো প্রশ্ন করলো না বা বীমার টাকা দাবি করার মতোও কিছু বললো না। ইমরান পুরো ঘটনাকে তার ভাগ্য বলে মেনে নিল। বললো, ‘কোনো কিছুই আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে ঘটে না। ইমরান শান্ত কন্ঠে বললো, ‘টাকা আসে, আবার যায়। আমরা যখন মারা যাই, তখন কেউই টাকা পয়সা নিয়ে যেতে পারি না।’ ইমরান আরো বললো, ‘তুমি কোনো কিছু নিয়ে চিন্তা করো না, বরং পরবর্তী প্লেন ধরে পাকিস্তানে চলে এসো।’
আমি ইমরানের শান্ত প্রতিক্রিয়া দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। ইমরান অন্য মুসলিমদের মতো, কোনো রকম চাপ নেয়া ছাড়াই, ভাগ্যকে সহজভাবে মেনে নিত; তা যতো অসহনীয়ই হোক না কেন।
.
There are no reviews yet.